শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
Newspaper

অর্থনীতি

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত: বৈশ্বিক ডিজিটাল অর্থনীতিতে নতুন শঙ্কা

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত: বৈশ্বিক ডিজিটাল অর্থনীতিতে নতুন শঙ্কা

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ শুধু ভূরাজনীতি বা জ্বালানি বাজারেই প্রভাব ফেলছে না, এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বৈশ্বিক প্রযুক্তি খাতেও। প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে তা সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, ক্লাউড অবকাঠামো এবং ডিজিটাল অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, গাড়ি, ই–কমার্স থেকে শুরু করে ব্যাংকিং সেবা পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তি খাতের সরবরাহ শৃঙ্খল এখন অত্যন্ত আন্তঃনির্ভরশীল। চিপ উৎপাদনের কাঁচামাল আসে এক অঞ্চল থেকে, জ্বালানি আসে অন্য জায়গা থেকে, আর উৎপাদন হয় ভিন্ন দেশে। ফলে একটি আঞ্চলিক সংঘাতও খুব দ্রুত বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তি শিল্পকে প্রভাবিত করতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি সেই বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে।

বিশ্বের ডিজিটাল অবকাঠামোর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কম্পিউটার চিপ বা সেমিকন্ডাক্টর। স্যাটেলাইট থেকে শুরু করে স্মার্টফোন, চিকিৎসা প্রযুক্তি কিংবা বৈদ্যুতিক গাড়ি-সব ক্ষেত্রেই এই ক্ষুদ্র চিপ অপরিহার্য। ফলে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে কোনো বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব সরাসরি পড়তে পারে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবায়।

বর্তমান সংঘাতের কারণে চিপ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে হিলিয়াম ও ব্রোমিনের মতো উপাদান এ শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এসব উপাদান সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

একটি আধুনিক মাইক্রোচিপ তৈরি করতে বহু ধাপের জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। শুরুতে সিলিকন থেকে তৈরি করা হয় একটি মসৃণ ওয়েফার। এরপর বিভিন্ন ধাপে তার ওপর সূক্ষ্ম সার্কিট নকশা বসানো হয়। ফটোলিথোগ্রাফি নামের প্রযুক্তির মাধ্যমে আল্ট্রাভায়োলেট আলো ব্যবহার করে সেই নকশা তৈরি করা হয়। এরপর রাসায়নিক বিক্রিয়া ও বিশেষ যান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ওয়েফারের নির্দিষ্ট অংশ অপসারণ বা পরিবর্তন করা হয়। এই পুরো প্রক্রিয়া বহুবার পুনরাবৃত্তি হয়ে একটি ক্ষুদ্র সিলিকন টুকরোর মধ্যে কোটি কোটি ট্রানজিস্টর তৈরি করা সম্ভব হয়।

এই উৎপাদন প্রক্রিয়ায় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সে জন্য ব্যবহৃত হয় হিলিয়াম গ্যাস, যা অত্যন্ত স্থিতিশীল এবং দ্রুত তাপ অপসারণ করতে সক্ষম। লিথোগ্রাফি যন্ত্র, এচিং সিস্টেম এবং অন্যান্য উচ্চক্ষমতার মেশিনে এই গ্যাস তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে অতিনিম্ন তাপমাত্রার কুলিং ব্যবস্থাতেও এটি ব্যবহৃত হয়।

সমস্যা হলো, হিলিয়ামের বিকল্প প্রায় নেই এবং বিশ্বে মাত্র কয়েকটি দেশ এই গ্যাস উৎপাদন করে। কাতার, যুক্তরাষ্ট্র ও আলজেরিয়া এর প্রধান সরবরাহকারী। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত তীব্র হলে এই সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে ব্রোমিনও সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক উপাদান। এটি ইলেকট্রনিক কেমিক্যাল ও ফটোরেজিস্ট তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। ফটোলিথোগ্রাফি এবং ওয়েফার প্রসেসিংয়ের বিভিন্ন ধাপে ব্রোমিনভিত্তিক যৌগ প্রয়োজন হয়। ফলে এর সরবরাহ ব্যাহত হলে চিপ উৎপাদনও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ এখন সীমিত কয়েকটি অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ, অবরোধ বা পরিবহন বিঘ্নিত হলে এসব উপাদানের সরবরাহে সমস্যা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর প্রভাব পড়তে পারে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর উৎপাদন ব্যয়ে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই চাপ সৃষ্টি করবে।

এ অবস্থায় ইলেকট্রনিক পণ্যের দাম বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। একই সঙ্গে ক্লাউডভিত্তিক সেবার ব্যয়ও বাড়তে পারে। কারণ আধুনিক ডিজিটাল অর্থনীতির বড় অংশই এখন ক্লাউড অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। অনলাইন স্টোরেজ, ভিডিও স্ট্রিমিং, সফটওয়্যার সেবা কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সব ক্ষেত্রেই বিশাল ডেটা সেন্টারের প্রয়োজন হয়।

ডেটা সেন্টার পরিচালনায় ব্যবহৃত হয় বিপুল সংখ্যক সার্ভার ও চিপ। ফলে চিপের দাম বাড়লে বা সরবরাহ কমে গেলে ক্লাউড সেবার খরচও বাড়তে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে গ্রাহকদের সাবস্ক্রিপশন ব্যয়েও।

ডিজিটাল অর্থনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো অনলাইন ব্যাংকিং ও পেমেন্ট ব্যবস্থা। আধুনিক আর্থিক লেনদেন ও আন্তর্জাতিক পেমেন্ট নেটওয়ার্ক ডেটা সেন্টার ও নেটওয়ার্ক অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। প্রযুক্তি অবকাঠামোতে অস্থিরতা দেখা দিলে এসব সেবার স্বাভাবিক কার্যক্রমও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

ই–কমার্স খাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। কারণ অনলাইন বাণিজ্যের পুরো কাঠামোই নির্ভর করে ক্লাউড কম্পিউটিং, ডেটা প্রসেসিং এবং ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার ওপর। প্রযুক্তি খাতে ব্যয় বাড়লে ই–কমার্স কোম্পানিগুলোর পরিচালন ব্যয়ও বাড়বে।

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে প্রযুক্তি অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়েও নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কিছু ড্রোন হামলায় সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের কয়েকটি ডেটা সেন্টার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এতে অগ্নিকাণ্ড ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ঘটনা ঘটেছে এবং আঞ্চলিক কিছু ব্যাংকিং সেবাও সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে অনেক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান তাদের আঞ্চলিক কার্যক্রমে পরিবর্তন আনছে। কিছু প্রতিষ্ঠান কর্মীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে অফিস সাময়িকভাবে বন্ধ করেছে। আবার কেউ কেউ গ্রাহকদের অন্য অঞ্চলে ডেটা স্থানান্তরের পরামর্শ দিচ্ছে।

ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের শুরুতে প্রধান লক্ষ্য ছিল জ্বালানি অবকাঠামো। কিন্তু এখন ডেটা সেন্টার ও ক্লাউড নেটওয়ার্কও কৌশলগত অবকাঠামো হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ফলে ডিজিটাল অবকাঠামোও নতুন ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামালের সরবরাহে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন প্রযুক্তি বিশ্লেষকেরা। যদিও এখনো প্রভাব সীমিত, তবে সংঘাত দীর্ঘ হলে সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারে।

জ্বালানি নিরাপত্তাও এ সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। বিশ্বের উন্নতমানের কম্পিউটার চিপের বড় অংশ উৎপাদিত হয় তাইওয়ানে, যা জ্বালানির জন্য আমদানিনির্ভর। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন ব্যাহত হলে তাইওয়ানের জ্বালানি সরবরাহও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এতে চিপ উৎপাদন ব্যাহত হলে তার প্রভাব পড়বে পুরো বৈশ্বিক প্রযুক্তি শিল্পে।

এদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের ফলে মেমোরি চিপের চাহিদা বেড়েছে। এসব চিপের বড় অংশ উৎপাদন করে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলো। যদি উৎপাদন ব্যাহত হয় বা দাম বেড়ে যায়, তাহলে এআই অবকাঠামো নির্মাণের ব্যয়ও বেড়ে যাবে এবং প্রযুক্তির বিস্তার ধীর হতে পারে।

সংঘাতের প্রভাব ইতিমধ্যে শেয়ারবাজারেও দেখা যাচ্ছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর দক্ষিণ কোরিয়ার সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানিগুলোর বাজারমূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতার কারণে অনেক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান তাদের আঞ্চলিক কার্যক্রম সীমিত করতে বাধ্য হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত দ্রুত শেষ না হলে তার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বৈশ্বিক ডিজিটাল অর্থনীতিকেও দীর্ঘ সময়ের জন্য অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলতে পারে।

আরও

তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বড় ধাক্কা, টিকে থাকতে কৌশল বদলের তাগিদ

অর্থনীতি

তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বড় ধাক্কা, টিকে থাকতে কৌশল বদলের তাগিদ

দেশের তৈরি পোশাক খাতের প্রধান দুই বাজার যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) রপ্তানিতে বড় ধরনের ধস নেমেছে। চলতি ২০২৫-২...

২০২৬-০৪-১২ ০২:০৪

বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার

অর্থনীতি

আট মাসে রপ্তানি ২৯ বিলিয়ন ডলার, আমদানি ৪৬ বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার

বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েই চলছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) ঘাটতি বেড়ে ১৬ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এ...

২০২৬-০৪-১০ ১৭:৫৫

বাংলাদেশ ব্যাংক চালু করলো ৫ হাজার কোটি টাকার কম সুদের প্রি-শিপমেন্ট ঋণ

অর্থনীতি

বাংলাদেশ ব্যাংক চালু করলো ৫ হাজার কোটি টাকার কম সুদের প্রি-শিপমেন্ট ঋণ

বাংলাদেশ ব্যাংক রপ্তানিমুখী খাতের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার কম সুদে প্রি-শিপমেন্ট ঋণ পুনরায় চালু করেছে।

২০২৬-০৪-১০ ০৫:০০

শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের মুনাফা বেড়েছে ১১৮ শতাংশ

অর্থনীতি

শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের মুনাফা বেড়েছে ১১৮ শতাংশ

গত ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত ২০২৫ হিসাব বছরে আগের বছরের তুলনায় শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসির নিট মুনাফায় ১১৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হ...

২০২৬-০৪-০৯ ১৮:২১

সরকার পাটজাত পণ্যের উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে : মন্ত্রী

অর্থনীতি

সরকার পাটজাত পণ্যের উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে : মন্ত্রী

বস্ত্র ও পাট মন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির জানিয়েছেন, বর্তমান সরকার পাটজাত পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি ও রপ্তানি বৃদ্ধির পরিক...

২০২৬-০৪-০৯ ১৭:৫৫